সম্মোহন

Fonte: Reincarnatiopedia

সম্মোহন (ইংরেজি: Hypnosis) হল মন ও চেতনার একটি পরিবর্তিত অবস্থা, যাতে ব্যক্তির মনোযোগ অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত হয়, প্রান্তীয় সচেতনতা হ্রাস পায় এবং পরামর্শ গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। এটি একটি মানসিক প্রক্রিয়া বা এমন এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে একজন প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ (সম্মোহনকারী) শব্দ ও মানসিক চিত্রের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির (সম্মোহিত ব্যক্তি) উপলব্ধি, অনুভূতি, চিন্তাভাবনা বা আচরণে পরিবর্তন আনতে পারেন। সম্মোহন কোনও জাদু বা অতিপ্রাকৃত শক্তি নয়, বরং এটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

সংজ্ঞা

সম্মোহনকে সাধারণত একটি পরিবর্তিত চেতনার অবস্থা হিসাবে বর্ণনা করা হয়, যদিও এর প্রকৃতি নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এটি ঘুম বা অচেতন অবস্থা নয়, বরং একটি উচ্চ স্তরের কেন্দ্রীভূত মনোযোগ এবং পরামর্শযোগ্যতার অবস্থা। এই অবস্থায় ব্যক্তি তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে স্বাভাবিক সচেতনতা হারায় না, কিন্তু নির্দিষ্ট একটি ধারণা বা পরামর্শের উপর গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। সম্মোহনের বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে: সম্মোহন-প্রবণতা (ব্যক্তিভেদে ভিন্ন), পরামর্শযোগ্যতা বৃদ্ধি, কল্পনাশক্তির তীব্রতা, এবং সময় ও স্থানের বিকৃত উপলব্ধি। এটি একটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়া; সম্মোহনকারী কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্মোহিত করতে পারেন না।

ইতিহাস

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

সম্মোহনের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা হয় ফ্রান্ৎস আন্তন মেসমার (১৭৩৪-১৮১৫) এর কাজের মাধ্যমে, যিনি "প্রাণী চুম্বকত্ব" বা "মেসমেরিজম" তত্ত্ব প্রদান করেন। যদিও তার তত্ত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়, তবুও তিনি মনোযোগ ও প্রভাবের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন আনার ধারণা প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে ১৯শ শতাব্দীতে স্কটিশ চিকিৎসক জেমস ব্রেইড "হিপনোটিজম" শব্দটি প্রবর্তন করেন এবং এটিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০শ শতাব্দীতে মিল্টন এরিকসন-এর কাজ সম্মোহন চিকিৎসাকে আমূল পরিবর্তন করে; তার অনানুষ্ঠানিক ও পরোক্ষ পদ্ধতিগুলি এরিকসনীয় সম্মোহন নামে পরিচিতি পায়।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে ইতিহাস

বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে সম্মোহনের মতো প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক উপস্থিতি প্রাচীন। যোগ-ধ্যানতান্ত্রিক সাধনার বিভিন্ন কৌশলে সম্মোহনের ন্যায় চেতনার পরিবর্তিত অবস্থা সৃষ্টির বিবরণ পাওয়া যায়। সিদ্ধপুরুষ বা ফকিরদের দ্বারা মন্ত্র, তাবিজ বা দৃষ্টির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের গল্প লোকসাহিত্যে প্রচলিত, যা সম্মোহনিক প্রভাবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ঔপনিবেশিক যুগে পাশ্চাত্য সম্মোহন চর্চা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে কলকাতা ও ঢাকার কিছু চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী সম্মোহন চিকিৎসা নিয়ে কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশে ডাঃ এম এ জলিল, ডাঃ হারুন অর রশীদ প্রমুখ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ডাঃ বিনয় কুমার সরকার প্রাথমিকভাবে এই ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।

প্রকারভেদ

সম্মোহনকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়:

  • পরম্পরাগত/প্রত্যক্ষ সম্মোহন: এতে সম্মোহনকারী সরাসরি ও কর্তৃত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন।
  • এরিকসনীয় সম্মোহন: এটি একটি পরোক্ষ ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি, যেখানে গল্প, রূপক ও রূপালঙ্কারের ব্যবহার করা হয়।
  • স্ব-সম্মোহন: ব্যক্তি নিজেই নির্দিষ্ট সংকেত বা ধারণার মাধ্যমে নিজেকে সম্মোহিত অবস্থায় নিয়ে যান। এটি চাপ ও উদ্বেগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর।
  • ক্লিনিকাল সম্মোহন: চিকিৎসা বা মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষিত পেশাদার দ্বারা প্রয়োগ।
  • বিনোদনমূলক সম্মোহন: মঞ্চে বা গণমাধ্যমে প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে অপ্রত্যাশিত কাজ করানো হয়।
  • রিগ্রেশন সম্মোহন: এই পদ্ধতিতে ব্যক্তিকে তার অতীত স্মৃতি, বিশেষ করে শৈশব বা জন্মপূর্ব সময়ে (পূর্বজন্মের ধারণা সহ) "নিয়ে যাওয়া" হয়। এটি বিতর্কিত, তবে কিছু চিকিৎসক ট্রমা বা ফোবিয়া নিরসনে এর ব্যবহার করেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় সম্মোহনের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। fMRIEEG স্ক্যানের মাধ্যমে দেখা গেছে, সম্মোহিত অবস্থায় মস্তিষ্কের কার্যকলাপে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে ডরসোলেটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর সক্রিয়তা হ্রাস পায়, যা সমালোচনামূলক চিন্তা ও সচেতন নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সইনসুলা-এর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, যা শরীর-মন সংযোগ ও পরামর্শযোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে সম্মোহন ব্যথা উপশম (অ্যানালজেসিয়া), উদ্বেগ কমানো, এবং কিছু মানসিক ও শারীরিক লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। তবে এটি একটি প্লাসিবো বা নন-স্পেসিফিক প্রভাব নয়, বরং এর সুনির্দিষ্ট স্নায়বিক ভিত্তি রয়েছে।

প্রয়োগ

সম্মোহনের প্রয়োগ ক্ষেত্র ব্যাপক:

  • চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান ও মনোচিকিৎসা: উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ফোবিয়া, PTSD, মানসিক আঘাত (ট্রমা) নিরসন, খাদ্যাভ্যাস ও ওজন নিয়ন্ত্রণ, নেশা দূরীকরণ (ধূমপান ত্যাগ)।
  • চিকিৎসা ক্ষেত্রে: ব্যথা ব্যবস্থাপনা (ডেন্টাল প্রসিডিউর, প্রসব ব্যথা, ক্রনিক পেইন), সাইকোসোমাটিক ডিজঅর্ডার (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম), ত্বকের রোগ (পসোরিয়াসিস) এবং ক্যান্সার চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাস।
  • ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান: ক্রীড়াবিদদের মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি।
  • শিক্ষা: স্মৃতিশক্তি ও শেখার দক্ষতা বাড়ানো, পরীক্ষাভীতি কাটানো।
  • ব্যক্তিগত উন্নয়ন: আত্ম-সম্মোহনের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, লক্ষ্য অর্জন, খারাপ অভ্যাস ত্যাগ।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপটে আইনি অবস্থা

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সম্মোহন চর্চার জন্য কোনও সুস্পষ্ট ও আলাদা জাতীয় আইন বা রেগুলেটরি বডি নেই। তবে, এটি সংশ্লিষ্ট পেশাদার নীতিমালার অধীন:

  • বাংলাদেশে: সম্মোহন যদি চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা কেবল রেজিস্টার্ড চিকিৎসক বা ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট-দের দ্বারা প্রয়োগ করা উচিত বলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ও বাংলাদেশ সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএস) নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। বিনোদনমূলক সম্মোহন-এর জন্য কোনও স্পষ্ট আইন না থাকলেও, যদি এটি কোনও ব্যক্তির মানসিক বা শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়, তবে দণ্ডবিধির আওতায় মামলা হতে পারে।
  • ভারতে: ভারতেও পরিস্থিতি প্রায় একই। ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (IMA) এবং রিজার্ভেশন অফ সাইকোলজিস্টস অ্যাক্ট অনুযায়ী, ক্লিনিকাল প্রয়োগ শুধুমাত্র যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাদারদের জন্য। মঞ্চ সম্মোহন নিয়ে কিছু রাজ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে, কারণ এটি অপব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ। কোনও অযোগ্য ব্যক্তি "চিকিৎসা" দিলে তা প্রতারণা বা নেগলিজেন্সের আওতায় আসতে পারে।

সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশ ও ভারতের সমাজে সম্মোহন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি দ্বৈত ও জটিল। একদিকে, শহুরে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈজ্ঞানিক সম্মোহন চিকিৎসা সম্পর্কে আগ্রহ ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমবর্ধমান। অন্যদিকে, গ্রামীণ ও অল্প শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি প্রায়শই জাদু, টোনা, অশরীরী শক্তি বা ভূত-প্রেত-এর সাথে জড়িত ধারণার সাথে মিশে যায়। অনেকেই সম্মোহনকারীকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে ভুল বুঝতে পারেন। বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক ও সাহিত্যে সম্মোহনকে প্রায়শই রহস্য বা নেতিবাচক শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ও ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে টক শো, স্বাস্থ্যবিষয়ক ম্যাগাজিন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচারের ফলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের উল্লেখযোগ্য অনুশীলনকারী

এই অঞ্চলে সম্মোহন চিকিৎসাকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত করতে যারা ভূমিকা রেখেছেন:

  • ডাঃ বিনয় কুমার সরকার (ভারত): কলকাতার বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সম্মোহন চিকিৎসক, যিনি এই বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন।
  • ডাঃ এম এ জলিল (বাংলাদেশ): বাংলাদেশে ক্লিনিকাল সম্মোহন চিকিৎসার পথিকৃৎদের একজন।
  • ডাঃ হারুন অর রশীদ (বাংলাদেশ): ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে সম্মোহন চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছেন।
  • ডাঃ সনৎ কুমার সাহা (ভারত/পশ্চিমবঙ্গ): সম্মোহন ও মনোবিজ্ঞানের উপর বহু গবেষণাপত্রের লেখক।
  • ডাঃ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (বাংলাদেশ): মনোচিকিৎসক, যিনি সম্মোহনকে তার চিকিৎসা পদ্ধতিতে নিয়মিত অন্তর্ভুক্ত করেন।
  • ডাঃ অরুণা গুপ্তা (ভারত): দিল্লির একজন ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট, যিনি মহিলা ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে সম্মোহনের প্রয়োগে বিশেষজ্ঞ।

এছাড়াও, বাংলাদেশ সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (BPS) এবং ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ক্লিনিকাল অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল হিপনোসিস (ISCEH)-এর মতো সংগঠনগুলি গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিক অনুশীলনকে উৎসাহিত করে।

আরও দেখুন